বিষণ্নতা আত্মহত্যার অন্যতম কারণ

119

প্রতিদিনই আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশে পুরুষের তুলনায় নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। আত্মহননকারী নারীদের বয়স ১৪ থেকে ৩০-এর মধ্যে। এর বড় একটা কারণ হলো হতাশা বা ডিপ্রেশন। এই হতাশারও কারণ বহুবিধ যেমনÑ ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যা, দাম্পত্য কলহ, পরকীয়া, প্রেম, যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতন। কোনো নির্যাতনে শিকার হওয়ার পর নিজের প্রতি ঘৃণাবোধ। শিক্ষাক্ষেত্রে ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি, উত্ত্যক্ত করায় হতাশ হয়ে আত্মহত্যা। দারিদ্র্য, অপ্রাপ্তি, অর্থনৈতিক মন্দা। এসব ছাড়াও আরও কিছু কারণ আছে যেমনÑ বর্তমানে প্রযুক্তির প্রতি অত্যধিক আসক্তি, আত্মহত্যার উপকরণের সহজপ্রাপ্যতা, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অস্থিরতা। নগরায়ণ ও পরিবারতন্ত্রের বিলুপ্তি। দুরারোগ্য ও জটিল রোগ যন্ত্রণা থেকে আত্মাহুতি। চরম হতাশা ও হতাশাজনিত মানসিক রোগ। মাদকাসক্তি ও অ্যালকোহলে আসক্তি। সিজোফ্রেনিয়া, মৃগীরোগ। ব্যক্তিত্বের সমস্যা, এ ছাড়া কিছু বংশগত কারণও রয়েছে।

Advertisement
spot_img

ডিপ্রেশন মানুষের শারীরিক, মানসিক ও কর্মক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। এই ডিপ্রেশনে আক্রান্ত রোগীরা নীরবে-নিভৃতে আত্মহত্যা করে বসেন। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের আত্মহত্যার প্রধান কারণ এই ডিপ্রেশন। আর এই ডিপ্রেশন বেশি দেখা যায় মধ্য ও নিম্নআয়ের দেশগুলোতে।

শারীরিক ও মানসিকভাবে নারীরা ছেলেদের চেয়ে আলাদা। তাদের আবেগটা বেশি, এই অতি আবেগ অনেকেই দমন করতে পারে না, তখনই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এখানে তখন আবেগটাই তার কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। হতাশা, নিজেকে দোষী ভাবা থেকে রেহাই পেতেই তারা আত্মহত্যা করে। নারীরা বিষণ্ন্নতায় বেশি ভোগে। সেই কারণেও তাদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। বিশেষভাবে টিনএজারদের অকারণ আবেগের বাড়াবাড়িই তাদের আত্মহত্যার মূল কারণ। এ ছাড়া নারীরাই সামাজিক বৈষম্যেরও বেশি শিকার হয়। পারিবারিক, কর্মক্ষেত্রে, রাস্তাঘাটে এমনকি সম্পত্তিতে সবখানে নারীরা বেশি বৈষম্যের শিকার হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাদের অপমানগুলোকে কেউ চোখে দেখে না, সে নিজের ভেতরে গুমরে মরে। কাউকে বলে না, অনেক সময় বললেও কাজ হয় না। তখন তার নিজের সম্পর্কে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। একটা ছেলে কিন্তু এত সহজে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে না। নারীরা তো জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি পারিপার্শ্বিকতার ওপর নির্ভরশীল থাকে। আমাদের সামাজিকতাই তাকে নির্ভরশীল করে তৈরি করেছে। এই নির্ভরতার জায়গাটা যখন সরে যায়, তখন সে মনে করে তাকে দেখার কেউ নেই। সে কিছুই পারবে না। তখন ভাবে যে, তার আর বেঁচে থেকে লাভ নেই। এমনকি এককভাবে স্বনির্ভরতায় কোনো নারী বাঁচতে চাইলেও তার ওপরও সৃষ্টি করা হয় দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান নানান সামাজিক চাপ।

আঁচল ফাউন্ডেশন বলছে, ‘গত বছর স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী গড়ে প্রতি মাসে ২৭ জন আত্মহত্যা করে। তার মধ্যে ২৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মান-অভিমানের কারণে, প্রেমঘটিত কারণে ২৩ দশমিক ৩২ শতাংশ, আপত্তিকর ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ায় ৪ জন, শিক্ষকের মাধ্যমে অপমানিত হয়ে ৬, গেম খেলতে বাধা দেওয়ায় ৭, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে ২৭ জন আত্মহত্যা করেছে। এ ছাড়া মুঠোফোন কিনে না দেওয়ায় ১০ জন, মোটরসাইকেল কিনে না দেওয়ায় ৬ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।’

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের মনোচিকিৎসক ডা. তানজিনা শারমিন বলেন, ‘আত্মহত্যার অন্যতম কারণ ডিপ্রেশন। তিনি বলেন, ‘মেয়েদের আবেগের জায়গাগুলো অনেকেই বুঝতে চায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের অসংলগ্ন আচরণগুলো আমরা সাধারণ মানুষরা ধাতব্যের মধ্যে আনি না। এ ব্যাপারগুলো এড়িয়ে না গিয়ে যেটা করা যায়, তাদের আবেগের প্রতি সচেতন হওয়া, বিষণ্নতায় ভুগলে তার চিকিৎসা করা। নারীদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা, পরিবারে যেন বৈষম্যের শিকার না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া। যে কোনো দুঃখকে জয় করে আনন্দের সঙ্গে জীবনযাপন করা যায় এ শিক্ষাটা দেওয়া খুব জরুরি।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, ’আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে এমন মানুষকে যদি চিহ্নিত করা যায়, তবে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কথা বলার সুযোগ পেলে, ওই ব্যক্তিকে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা থাকে।’

মানুষকে আত্মহত্যা থেকে বিরত রাখতে ‘কান পেতে রই’ নামে একটি সংগঠন রয়েছে। বাংলাদেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকা আত্মহত্যার প্রবণতাকে কমাতে ২০১৩-এর ২৮ এপ্রিল এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এদের নির্দিষ্ট কিছু হেল্পলাইনের মাধ্যমে হতাশাগ্রস্ত মানুষের কল গ্রহণ করে তাদের কথাগুলো শুনে তাদের নিরাশা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা দূর করতে ফ্রি কাউন্সেলিং করা হয়।

অতিরিক্ত আবেগের বিড়ম্বনা ও নিরাশাকে রুখতে পরস্পরের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রথা গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে সন্তানদের শারীরিক, মানসিক চাপ মোকাবিলা করার জন্য ধৈর্য ও সহনশীলতার শিক্ষা দিতে হবে।

স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। (তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট)

 

Advertisement
spot_img