মরহুম এডভোকেট ফয়জুর রহমান স্মরণে

175

বরেণ্য আইনবিদ, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, চন্দনাইশ মনিষা, ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম জেলা বার এসোসিয়েশন এর প্রবীণ সদস্য মরহুম এডভোকেট ফয়জুর রহমানের আজ প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী।গত বছরের ২৭ জুন ৯০ বছর বয়সে তিনি মহান প্রভূর ডাকে সাড়া দিয়ে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি ছিলেন সমাজহিতৈষী, স্বাধীনতার স্থপতি মরহুম শেখ মুজিবর রহমানের ঘনিষ্ট ও রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী, বিশিষ্ট আইনবিদ ও একজন সফল পিতা।তিনি মানবিক সমাজ রচনার একজন নিভৃতচারী মানুষ ছিলেন।মরহুম ছিলেন একজন শান্তিপ্রিয় মানবদরদী ধর্মপ্রাণ মানুষ।দীর্ঘ ৬০ বছরের অধিককাল তিনি আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন।এডভোকেট ফয়েজুর রহমান এর গ্রামের বাড়ী চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশের বৈলতলী।

Advertisement
spot_img

১৯৩৩ সালে ৬ আগস্ট তাঁর জন্ম।এডভোকেট ফয়জুর রহমানের পিতা মরহুম কোরবান আলী, মা মরহুমা মোছাম্মদ সোনাজান। তাঁর দাদা মরহুম মোহাম্মদ ওয়ালী, দাদী মরহুমা মিছরী খাতুন। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে উনি ছিলেন মা- বাবার মেজো সন্তান।পড়ালেখায় প্রচণ্ড আগ্রহের কারণে তিনি মা-বাবার অতি আদুরে ছিলেন। সে সময় বৈলতলী গ্রামে তিনিই প্রথম ডিগ্রি পাশ করেন। দূর-দূরান্ত থেকে তাঁকে বিভিন্ন মানুষ দেখতে আসতেন। এই অপার সময়ে তিনি একাই নিজের পুরো পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন।১৯৫০ সালে ইস্ট বেঙ্গল সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ডের অধীনে বড়মা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫২ সালে ইন্টারমেডিয়েট পাশ করেন।

১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সরকারি কলেজ অফ কমার্স থেকে বাণিজ্যে স্নাতক অর্জন করেন। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম আইন কলেজ থেকে অর্জন করেন আইনে স্নাতক (এলএল.বি)ডিগ্রি ।১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্লিডার সার্ভে পরীক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে প্লিডার সার্ভে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।এলএল.বি ডিগ্রী লাভ করে তিনি চট্টগ্রাম জজকোর্টে এডভোকেট হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ ষাট বছরের অধিককাল তিনি আইন পেশায় যুক্ত থেকে বিচার প্রার্থী অগণন মানুষকে আইন সেবা দিয়ে গেছেন।

আমার বাবা মরহুম এডভোকেট আলহাজ্ব আবু মোহাম্মদ য়্যাহ্য়্যা এবং আমার শ্বশুর আব্বা চট্টগ্রাম আইন কলেজের সাবেক শিক্ষক মরহুম আলহাজ্ব ব্যারিস্টার আমিনুল হক এর সাথে ঘনিষ্ঠতার কারনে তাঁকে আংকেল হিসেবেই সম্বোধন করতাম। লালখান বাজার পশ্চিম হাইলেভেল রোডে অবস্থিত আমার শ্বশুর বাড়ী ‚হেলেন ভিউ” এর নিকটেই তাঁর বাসা ছিল। তাঁর বড়ো পুত্র সন্তান বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও চট্টগ্রাম বার এসোসিয়েশন এর সদস্য থাকাকালীন তাঁর সাথেও আমার অত্যন্ত হৃদ্যতা ও ভাতৃপ্রতিম সম্পর্কের কারনে ফয়জুর রহমান আংকেলকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতাম।তাঁরা নন্দনকানন এলাকায় বসবাসকালেও ছাত্রজীবন থেকে স্কাউটিং করা কালে আরিফ ভাইয়ের সাথে পরিচয় ছিল। তিনি একজন সংগীত শিল্পীও বটে। তার সুললিত কন্ঠে আধুনিক গান সকলকে বিমোহিত করে।মরহুম ফয়েজ আংকেল সজ্জন বিনয়ী মানুষটি ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতি করেছেন এবং স্কুল কলেজে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থেকেছেন।

১৯৫২ সালে তিনি ভাষা আন্দোলনেও অংশ নেন। তিনি প্রথম থেকেই মনে-প্রাণে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৬৫ সাল থেকে দীর্ঘদিন তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের (তৎকালীন মহকুমা আওয়ামী লীগ) ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন জনসভায় তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের হয়ে বিশাল সমাবেশের নেতৃত্ব দেন।

১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে পুরো দেশের মতো দক্ষিণ চট্টগ্রামে রাজনীতিতে উত্তাল হয়ে ওঠে। সেই সময় গণ-অভ্যুত্থানে তিনি রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭০ সাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দক্ষিণ চট্টগ্রাম আসবেন। উপলক্ষ সামনে নির্বাচন। জোর প্রচার ও সংগঠিত হচ্ছে মানুষ।পূর্ব- পাকিস্তানীদের উপর পশ্চিমাদের বৈষম্য চরমে পৌঁছেছে। ১৯৭০ সালে ২৬ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু দক্ষিণ-চট্টগ্রামে আসেন। বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা দেওয়া হয়।এই অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ছিলেন আংকেল এডভোকেট ফয়জুর রহমান।

তখন ২০১ সদস্য বিশিষ্ট বঙ্গবন্ধুর অভ্যর্থনা কমিটির সম্পাদক ছিলেন আতাউর রহমান খান কায়সার ও কোষাধ্যক্ষ ছিলেন এস এ খালেক।১৯৭০ সালের ২৪ এপ্রিলের দৈনিক আজাদী পত্রিকায় প্রকাশিত ‚দক্ষিণ মহকুমায় শেখ মুজিবের সফর, শেখ মুজিব অভ্যর্থনা কমিটির আহবান” শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে লিখা হয়, গত ২২ তাং এডভোকেট জনাব বদিউল আলমের সভাপতিত্বে সদর দক্ষিন মহকুমা আওয়ামী লীগের এক বর্ধিত সভায় এডভোকেট জনাব ফয়জুর রহমানকে চেয়ারম্যান, আতাউর রহমান খান কাইসারকে সম্পাদক, জনাব এম এ খালেক কে কোষাধ্যক্ষ করিয়া আরো কয়েকজন কর্মকর্তা ও ২০১ জন সদস্য সমবায়ে শেখ মুজিব অভ্যর্থনা কমিটি গঠিত হয়।

এডভোকেট ফয়জুর রহমান বঙ্গবন্ধুর এতটাই ভক্ত ছিলেন যে নিজের পুত্রদের নামের আগে তিনি —শেখ’ শব্দটি যুক্ত করে দেন। যা একটি বিরল ঘটনা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পথ প্রদর্শক ছিলেন। তিনি বান্দরবানে নিজের জায়গায় ঘর তৈরি করে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, টাকা পয়সা রসদ দিয়ে তাদের টিকিয়ে রেখেছেন।তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পরিবারের সাথে থাকতে পারেননি। সার্বক্ষণিক দেশ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। সব সময় টাকা পয়সা ও খবরাখবর নিয়ে বুদ্ধি দিয়ে তাদের সাহায্য করতেন।

এডভোকেট ফয়জুর রহমান ১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা প্যানেলের সদস্য এবং চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামীলীগের খাদ্য, কৃষি ও সমবায়, ত্রাণ, পুনর্বাসন কমিটির উপদেষ্টা প্যানেল সদস্য মনোনীত হন।১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ-সাতকানিয়া সংসদীয় আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রাথমিকভাবে তাঁকে মনোনয়ন দিতে রাজি হন, যা বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্যে বলতেন। কিন্তু পরবর্তীতে তা অন্যজনকে দেওয়ায় তিনি হতাশ হলেও আদর্শচ্যুত হননি। সবসময় তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রতি অনুগত ছিলেন।

১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার পর সামরিক লোকজন তাঁকে খুঁজছিলেন। এসময় তিনি কিছুদিনের জন্য আত্মগোপনে যান জেনারেল জিয়া ও এরশাদের আমলে তাঁকে রাজনীতি ও প্রশাসনে বিভিন্ন লোভনীয় পদের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। প্রার্থী যেই হোক, আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে সব সংসদ ও অন্যান্য সাধারণ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি এ ধরনের অবদান ও আনুগত্য বজায় রেখেছিলেন। সব সংকটময় সময়ে তিনি দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষক ও কৌশলগত উপদেষ্টা হিসেবে বিশেষ ভূমিকা রাখতেন। গ্রামের মানুষের সেবা করেছেন। সবসময় তাদের কথা ভাবতেন। সমাজ সেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহন করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আইন পেশায় সার্বক্ষণিক নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এডভোকেট ফয়জুর রহমান চন্দনাইশের সাতবাড়ীয়া কলেজ প্রতিষ্ঠায় আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।

১৯৯৭ সালে তিনি বৈলতলী উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন।এডভোকেট ফয়জুর রহমান বিয়ে করেন সাতকানিয়া নিবাসী মরহুম মৌলানা রশিদ আহমদ নদভী-এর তৃতীয় কন্যা হোসনে আরা বেগমকে। মৌলানা রশিদ ছিলেন চট্টগ্রাম শহরের তৎকালীন ইসলামিক ইন্টারমেডিয়েট কলেজের (বর্তমান সরকারি মহসিন কলেজ) উর্দু বিভাগের অধ্যাপক। ফয়জুর রহমানের সহধর্মিনী হোসনে আরা বেগম ইতোমধ্যে —রত্নগর্ভা মা’ সন্মাননা অর্জন করেন। এডভোকেট ফয়জুর রহমান ও হোসনে আরা বেগমের সংসার জীবনে শিক্ষা ও সাফল্যের সুবাতাস বইতে থাকে। জ্যেষ্ঠ কন্যা ফরিদা পারভীন সাবেক এজিএম, সোনালী ব্যাংক; মেজো কন্যা ডা. রোকসানা পারভীন; জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যারিস্টার শেখ হাসান আরিফ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি; মেজো পুত্র শেখ হাছান শহিদ প্রকৌশলী ও সুবসতি প্রপার্টিজের চেয়ারম্যান; সেজো পুত্র ডা. মো. শেখ হাছান মামুন —হৃদরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ’ ও বর্তমানে এভার কেয়ার হাসপাতালে —সিনিয়র কনসালটেন্ট- ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলোজিস্ট’ হিসেবে দায়িত্বরত আছেন; কনিষ্ঠ পুত্র শেখ হাছান জামান ভারতের ব্যাঙ্গালোর থেকে এমবিএ সম্পন্ন করে বর্তমানে রপ্তানী ব্যবসার সাথে জড়িত আছেন এবং ছোট কন্যা শবনম পারভীন এমবিএ সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি বেসরকারি ব্যাংকে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।মৃত্যুকালে তিনি ৪ ছেলে, ৩ মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণাগ্রাহী রেখে যান। মরহুমের ১ম জানাজা বাদে এশা লালখান বাজার এলাকায় ১ম জানাজা, এবং পরদিন সকাল ১০ টায় কোর্ট বিল্ডিং চত্বরে ২য় জানাজা এবং বাদে আছর চন্দনাইশের বৈলতলীস্থ নিজ গ্রামে ৩য় জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রবীণ এ আইনবিদ বার্ধক্যজনিত কারণে ২৭ই জুন ২০২২ইং বিকেলে নগরীর লালখানবাজারস্ত বাসভবনে ইন্তেকাল করেন।এডভোকেট ফয়জুর রহমানের পুত্র সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ বাবার মৃত্যুর পর কুলখানি উপলক্ষে সস্ত্রীক (জেবুন্নেসা বেগম শেলী সহ) চট্টগ্রামের চন্দনাইশে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন।সেখানে দুপুরে তার স্ত্রী জেবউন্নেসা শেলী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন।দ্রুত স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। জাস্টিস আরিফ ও জেবউন্নেসা দম্পতির তিন সন্তান যথাক্রমে দুই কন্যাঃ তাসফিয়া হাসান (২২), নামিরা হাসান(১৮); এক পুত্রঃ রেশাদ হাসান(৯)। ভাবীর শেষ ইচ্ছে ছিল স্বামী সন্তান নিয়ে কাশ্মীর বেড়াতে যাবেন। আমার কাছ থেকে আরিফ ভাই কিছু গাইড লাইনও নেন। আল্লাহ্ তাআলা তাঁর মেহমান করে তাঁকে নিয়ে যান। স্বামী ও শিশু সন্তানদের ফেলে তিনি আকস্মিকভাবে উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু বরন করেন।আল্লাহ্ তাআলা এ মহান শিক্ষাবিদ এডভোকেট ফয়জুর রহমান আংকেল ও তাঁর পুত্রবধূকে জান্নাতুল ফেরদৌসের চিরস্থায়ী বাসিন্দা করে দিন এবং তাদের ভালোও কাজগুলো সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করে নিন,আমীন।

লেখকঃজিয়া হাবীব আহ্সান, এডভোকেট , আইনবিদ,কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসন কর্মী।

Advertisement
spot_img