
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্রদলনেতা ওয়াসিম আকরামের মৃত্যুর এক বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০২৪ সালের এই দিনে নগরীর মুরাদপুর এলাকায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের অতর্কিত হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র ও ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম। তার মৃত্যু চট্টগ্রামের রাজনীতিতে মোড় ঘুরিয়ে দেয়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
ওইদিন দুপুর ২টার দিকে মুরাদপুর মোড়ে অবস্থান নেয় শতাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ওয়াসিম আকরাম। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা অবস্থান কর্মসূচি শুরু করলেও কিছুক্ষণ পরই তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা। গুলি চালায়, ইট-পাটকেল ছোঁড়ে। প্রথম গুলিতেই প্রাণ হারান ওয়াসিম। একই সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ শান্ত এবং কাঠ ব্যবসায়ী মো. ফারুক।
ওয়াসিমের মৃত্যু সংবাদ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে। নগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ। মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, ষোলশহর, জিইসি, ওআর নিজাম রোডসহ আশপাশের এলাকায় ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়ায় রণক্ষেত্র তৈরি হয়। আন্দোলনকারীরা বলছেন, ওই ঘটনার মধ্য দিয়েই বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলন নতুন গতি পায় এবং সেদিন থেকেই গণঅভ্যুত্থান আরও একধাপ এগিয়ে যায়।
ওই রাতেই চট্টগ্রাম কলেজ ক্যাম্পাসে ওয়াসিমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার জেলার পেকুয়ার দক্ষিণ মেহেরনামা গ্রামে দাফন করা হয়।
ওয়াসিমের পরিবার জানায়, ছোটবেলা থেকেই ইসলামি শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে বেড়ে ওঠেন তিনি। পবিত্র কোরআন হিফজ করেছেন। ‘ও’ লেভেল পাস করে কওমি ও সাধারণ ধারায় উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ওয়াসিম। ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও তার সব ভাবনায় ছিল সমাজের বৈষম্য দূর করা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করা।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলার সময় পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও তারা হামলাকারীদের প্রতিরোধ না করে বরং অনেক জায়গায় সহযোগিতা করেছে। এমনকি সাদা পোশাকে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গুলি চালাতে দেখা গেছে।
ওয়াসিমের পরিবার বলছে, এক বছরেও তারা কোনো সরকারি সহানুভূতি, সহায়তা বা ন্যায়বিচারের ইঙ্গিত পায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে শহীদ ওয়াসিমের চাচা মাওলানা জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘ওয়াসিম ছোটবেলা থেকেই সাহসী আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে গলা তুলত। তার মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারিনি। এখনও ঘরে কান্না থামেনি।’
তিনি জানান, ওয়াসিমের জানাজা-দাফন থেকেও পরিবার ছিল বিচ্ছিন্ন। আজও তারা রাস্তায়।
এলাকাবাসী বলেন, ওয়াসিম শুধু পরিবারের নয়, আমাদের সকলের ছায়া ছিলেন। তার নেতৃত্বেই তরুণেরা রুখে দাঁড়াতে শিখেছে।
শহীদ ওয়াসিমের পরিবার ‘১৬ জুলাই’কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বৈষম্যবিরোধী শহীদ দিবস’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি, ওয়াসিম হত্যার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তারা।
















