মাসিক এখনো আমাদের সমাজে ট্যাবু। বেশির ভাগ কিশোরী ও নারী জনসমক্ষে মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেন। কথাগুলো বলছিলেন খ্যাতিমান প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ইসরাত জাহান।
একজন কিশোরী বা নারী কীভাবে মাসিক চলাকালীন নিজেকে সুরক্ষা দিতে পারে তা নিয়ে দৈনিক আমাদের সময় স্টুডিওতে আয়োজন করা হয় ফ্রেশ অনন্যা স্যানিটারি ন্যাপকিন নিবেদিত বিশেষ অনুষ্ঠান ‘পিরিয়ডকালীন হাইজিনে NO কিন্তু’ অনুষ্ঠানের। অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন ডা. ইসরাত জাহান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ওষুধ বিশেষজ্ঞ ডা. ফাহিম আহমেদ রূপম।
advertisement
পিরিয়ড চলাকালীন কেন পরিষ্কার থাকা জরুরি ও এর গুরুত্ব নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ডা. ইসরাত জাহান বলেন, ‘মাসিক চলাকালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অনেক জরুরি। এ নিয়ে আমাদের দেশে অনেক সোশ্যাল ট্যাব বা সোশ্যাল স্টিগমা রয়েছে। এটা নিয়ে আমাদের দেশে অনেক কম আলোচনা হয়। মাসিক চলাকালীন যদি আমরা পরিচ্ছন্নতা মেনে না চলি তাহলে পরবর্তী সময়ে আমাদের জীবনে অনেক খারাপ কিছু হতে পারে। এ কারণে বন্ধ্যাত্ব রোগও হতে পারে। এজন্য আমাদের হাইজিন নিয়ে সচেতনতা খুবই জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘১২-১৩ বছরের একটি কিশোরীর যখন মাসিক শুরু হয় তখন সে লজ্জায় কাউকে কিছু বলতে পারে না বা বলতে চায়ও না। এরপর ওই কিশোরী যখন স্কুলে যায় তখন তার হঠাৎ করে মাসিক শুরু হয়। ওই সময় সে স্কুল থেকে কোনো সাপোর্ট পায় না। এরপর থেকে ওই কিশোরী স্কুলে যেতে চায় না, নিজের স্বাভাবিক কাজ থেকেও সে বিরত থাকে। এই লজ্জা আমাদের ভাঙতে হবে।’
স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘স্কুল-কলেজের বইগুলোতে মাসিক নিয়ে ছেলেমেয়ে সবাইকে জানাতে হবে। বোঝাতে হবে এটা স্বাভাবিক বায়োলজিক্যাল একটি প্রসেস। এ নিয়ে জড়তা বা লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। মা-বাবা-ভাই-বোন পরিবারের সদস্যদের ওই কিশোরী মেয়েকে মানসিক সাপোর্ট দিতে হবে। বোঝাতে হবে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। এই সময়ে সে নিজেকে কিভাবে সুরক্ষিত রাখবে সে বিষয়েও তাকে জানাতে হবে।’
ডা. ইসরাত জাহান বলেন, ‘বিজ্ঞানের কথা অনুযায়ী- মেয়েদের যখন পিরিয়ড চলে তখন নরমালি ভ্যাজাইনাতে পিএস থাকে। পিএসটা থাকে অ্যাসিডিক। অ্যাসিডিক থাকার কারণে আমাদের ভ্যাজাইনাতে অনেক ব্যাকটেরিয়া থাকে। তখন ব্যাকটেরিয়াগুলো বাড়তে করতে পারে না। পিরিয়ড যখন হয় তখন যে ব্লাড বের হয় সেটা অ্যালকালাইন। এই অ্যালকালাইন আর পিএস যখন শরীরের ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে এক হয় তখন ব্যাকটেরিয়া বাড়তে শুরু করে। এতে শরীরে নানা ক্ষতি হয়। এ কারণে র্যাশ ছাড়াও নানা সমস্যা হতে পারে।’
র্যাশ হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে- দীর্ঘক্ষণ ধরে যদি কোনো স্যানিটারি ব্যবহার করা হয় যেগুলোর শোষণ ক্ষমতা কম সেগুলো ব্যবহারের কারণে র্যাশ হয়। এই ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস যদি ইউট্রাসের ভেতরে প্রবেশ করে তাহলে জননতন্ত্রে ইনফেকশন করে ফেলে। পরবর্তীকালে টিউব বল্ক করে ফেলতে পারে। ডিম্বাশয়ে ডিমের পরিমাণ কমে যেতে পারে। এতে করে পরবর্তী জীবনে বন্ধ্যত্ব হতে পার। এ ছাড়া মূত্রনালিতে ইনফেকশন হতে পারে। এই ইনফেকশন যদি দীর্ঘদিন হয়ে যায় তাহলে ওই নারীর কিডনি ড্যামেজ হতে পারে। এ ছাড়া কিডনি ফেলিউর হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এই হাইজিন মেইনটেইন করার জন্য আমাদের নানা পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন, ট্যাম্পুল ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলো ব্যবহারের পর যেখানে সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। এ ছাড়া ভ্যাজাইনা পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে এরপর সাবান পানি দিয়ে হাত ভালোভাবে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।’
ইসরাত জাহান বলেন, গ্লোবালি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচ) ও ইউনিসেফ একসঙ্গে কিছু এজেন্ট ফিক্সড করে নিয়েছে। তার স্যানিটারি ন্যাপকিন, ট্যাম্পুল, সাবান পানি যাতে নারীর সব জায়গায় পায় তার ব্যবস্থা করেছে। মাসিক নিয়ে তার সর্বত্র সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছে।
‘আমাদের দেশের কথা যদি বলা হয়, ২০১৭ সালে ব্রিটেনে একটি স্ট্যাডি হয়েছিল ওখানে দেখা যায়, প্রতি ১০ জনের ভেতর একজন কিশোরী স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে পারে না। সেখানে আমাদের মতো আমাদের মতো দেশের অবস্থা অনুমান করাই যায়। আমাদের দেশে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে প্রবণতা খুবই কম। এখন পর্যন্ত হয়তো ২০-৩০ শতাংশ কিশোরী বা নারী স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন। এখনো অনেকই কাপড় ব্যবহার করেন।’
‘এর থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের দেশে সরকারিভাবেই হোক আর রাজনৈতিক ভাবেই হোক স্যানিটারি ন্যাপকিনের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। এটা যেন সবাই ব্যবহার করতে পারে তেমন দাম নির্ধারণ করতে হবে। আর মাসিক নিয়ে কিশোরীদের সচেতনতা পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। এছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়াতেও আমারা সচেতনতামূলক প্রচারণা করতে পারি।’