কোন কোন উপসর্গ দেখলেই ডেঙ্গু টেস্ট করা জরুরি?

156

ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে সবাই আতঙ্কে থাকেন। তবে অনেকেই জানেন না, এ জ্বরে ভুগলে রোগীর শরীরে কোন কোন উপসর্গ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেকে আবার এ-ও জানেন না, ঠিক কখন কোন কোন টেস্ট করাটা জরুরি ডেঙ্গু জ্বরে।

Advertisement
spot_img

সঠিক তথ্য এবং ডেঙ্গু সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান না থাকায় পরিবারের প্রিয় সদস্যকে অকালেই অনেকে হারান। তাই নিজ ও প্রিয় সদস্যের সুরক্ষা নিশ্চিতে আসুন জেনে নিই ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য।

ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যেটা এডিস মশার মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত ৪-১০ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর উপসর্গ শরীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ কারণে ডেঙ্গু জ্বরে জটিলতা বেশি হয়ে থাকে।

ডেঙ্গুর লক্ষণ/উপসর্গ

ডেঙ্গু সাধারণত দু-ধরনের-ক্লাসিক্যাল এবং হেমোরেজিক। তবে বেশি তীব্র হলে সেটাকে ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’ বলে। সাধারণত ডেঙ্গু হলে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দেয়–

• ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত প্রচণ্ড জ্বর এবং সেই সাথে হাড় ও শরীর ব্যথা থাকে।
• তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে। সেই সাথে ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দিয়ে আবার জ্বর আসতে পারে।
• মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা হয়।
• জ্বর হওয়ার ৪-৫ দিন পর শরীরে লালচে র‍্যাশ দেখা যায়।
• বারবার গলা শুকিয়ে যাওয়া এবং অত্যধিক পানি পিপাসা।
• খাবারে অরুচি এবং এর সাথে বমি বমি ভাব, পাতলা পায়খানা, পেটে ব্যথা, মাঝে মাঝে খিচুনিও হতে পারে।
• অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধের মাঝে মাঝে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে।
• পানি আসার কারণে অনেক সময় পেট ফুলে যেতে পারে।
• গরমের সময় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জ্বর দুদিন স্থায়ী হয়ে চলে যায়। বিবিসির একটি প্রতিবেদন বলছে, অনেক ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর জ্বর থাকে না। সে ক্ষেত্রে অন্য যে কোনো উপসর্গ দেখলেই ডেঙ্গু টেস্ট করে নিশ্চিত হতে পারেন আপনি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত কি না।
• ডেঙ্গু জ্বরে অনেক রোগীর রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, বুকে পেটে পানি আসে, যকৃত আক্রান্ত হওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

জ্বর হওয়ার কতদিনের মধ্যে কোন টেস্ট করলে ডেঙ্গু ধরা পড়ে?

স্বাভাবিক জ্বর থেকে ডেঙ্গু জ্বরের পার্থক্য টানতে চিকিৎসকরা শুধু শরীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠা লক্ষণগুলোতেই নজর দেন না। কারণ, অনেক সময় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর শরীরে লক্ষণ স্পষ্ট হয় না। তাই ডেঙ্গু নির্ণয়ে কিছু টেস্ট করাতে দেন চিকিৎসকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু জ্বর নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট হলো এনএসওয়ান। এই টেস্ট জ্বর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই করলে টেস্টের রেজাল্ট ভুল আসে। তাই চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন, টেস্টের রিপোর্ট যাতে শতভাগ নির্ভুলের জন্য জ্বরের ২ থেকে ৪ দিনের মধ্যে এ টেস্ট করতে হবে।

আবার ৪ দিন ডেঙ্গু জ্বর পেরিয়ে গেলে এ পরিস্থিতিতে রোগীর এনএসওয়ান টেস্ট করা যাবে না। কারণ হিসেবে চিকিৎসকরা বলছেন, জ্বরের ৪ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর এনএসওয়ান টেস্ট ভুল আসে।
তাই রোগীর ডেঙ্গু হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে করতে হবে আইজিজি ও আইজিএম। এ দুই টেস্টের মধ্যে রোগী আইজিজি টেস্ট না করলেও চলবে। তবে আইজিএম টেস্ট অবশ্যই করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইজিএম টেস্টেই ধরা পড়ে রোগীর ডেঙ্গু জ্বর।
টেস্টে ডেঙ্গু নিশ্চিত হলে উদ্বিগ্ন না হয়ে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার ও জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল অথবা নাপা খেতে দিন। ডেঙ্গু জ্বরে প্লাটিলেট কমে গেলে তা ভয়ের কারণ নয়। খেয়াল রাখুন, রক্তের প্লাটিলেট ১০,০০০-এর নিচে নেমে গেলে এবং সেই সঙ্গে রক্তপাত হলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীর সেবা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন।
ডেঙ্গুর ঘরোয়া চিকিৎসা

কিছু প্রাকৃতিক উপাদানের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ের ডেঙ্গু জ্বরকে কাবু করা সম্ভব। যেমন-

* বিশ্রাম নিন এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন অথবা তরল জাতীয় খাবার খান। শরীর হাইড্রেটেড থাকলে মাথাব্যথা ও পেশি ব্যথা কম হবে।

* প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে পেঁপে পাতার রস পান করুন, কারণ ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট কমে যায়। পেঁপে পাতার রস সংক্রমণ তাড়ানোর ক্ষমতাও বাড়াতে পারে।

* পেয়ারার শরবত পান করুন। এই পানীয়ের ভিটামিন সি রোগদমনতন্ত্রকে শক্তিশালী করে ডেঙ্গু সংক্রমণ উপশম করবে।

* এক মগ গরম পানিতে মেথি বীজ ভিজিয়ে পানীয়টি ঠান্ডা করে পান করুন। এতে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ন্ত্রণে থাকবে ও রোগ উপশমের ক্ষমতা বাড়বে।

* রোগের বিরুদ্ধে ভালো লড়াই করে এমন খাবার বেশি করে খান, যেমন- সাইট্রাস ফল, কাঠবাদাম, দই, সূর্যমুখী বীজ, গ্রিন টি, ক্যাপসিকাম, ব্রোকলি, পালংশাক, আদা, রসুন ও হলুদ।শক্তিশালী রোগদমনতন্ত্রের কাছে সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ সহজেই পরাস্ত হয়।

* রক্তের প্লাটিলেট বাড়াতে নিম পাতার রসও পান করতে পারেন। এটি শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যাও বৃদ্ধি করে। নিম পাতার রোগদমন ক্ষমতা বর্ধক শক্তিও আছে।

* তুলসি পাতাকে গোল মরিচের সঙ্গে পানিতে সিদ্ধ করে পানীয়টিকে ঠান্ডা করে পান করতে পারেন। এটি সংক্রমণের বিরুদ্ধে ভালো লড়াই করতে পারে। তুলসি পাতা চাবালেও রোগদমনতন্ত্র শক্তিশালী হবে।

* ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পুদিনা পাতার রসও বেশ কার্যকর। এটি সংক্রমণের জ্বর কমাতে পারে, রোগদমনতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে এবং প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে পারে।

* ডেঙ্গু উপশমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো বার্লি চা। এটি ভিটামিন বি১, ভিটামিন বি২, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি১২, ফোলেট, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড ও মিনারেলে সমৃদ্ধ। এসবকিছু রক্তের প্লাটিলেট ও লোহিত রক্তকণিকা বাড়াতে একত্রে কাজ করে।

Advertisement
spot_img