প্রতিশ্রুতি @ নুজহাত ইসলাম

49

প্রতিশ্রুতি

Advertisement
spot_img

@ নুজহাত ইসলাম
(আমার নিজের জীবনের ছায়া অবলম্বনে একটি ছোট গল্প)

সৌরভ তীব্র গরমে ঘামতে ঘামতে বাড়ি ফিরছিলো।সন্ধ্যা নেমে আসার পরও গরমের দাবড়ানি এখনো থামেনি।কোনরকম বাসে একটা সিট পেয়ে ভাবছিলো কি যেন মা বলেছিলো অফিস ফিরতি বাসায় নিয়ে যেতে ; কিছুতেই মনে পড়লো না।বাস থেকে নেমে হাটতে হাটতে গেইটের কাছে পৌঁছুতেই মনে পড়লো বাবার চশমাটি দোকান থেকে আনা হয়নি।বাবা দুই দিন থেকে খবরের কাগজ পড়তে না পেরে বাড়ি মাত করছেন।আজ বকা একটাও মাটিতে পরবে না।কি আর করা আল্লাহর নাম নিয়ে সৌরভ বাড়িতে ঢুকে পরলো।

ভাই এর ঘরে ঢোকার শব্দ পেয়ে ছোট বোন মিনু দৌড়ে এসে বললো ; ভাইয়া বাবার চশমা এনেছো? সৌরভ গম্ভীর গলায় বললো ; কাল আনবো।যা চা নিয়ে আয়।এদিকে মিনু ভাইকে বাঁচাতে বাবাকে বললো; বাবা জানো ? আজ চশমার দোকানের সামনে খুব গন্ডগোল হয়েছে দুই রাজনৈতিক দলের।মিনুর বাবা চশমার কথা ভুলে গিয়ে সেখানে কি হয়েছে জানতে চাইলে,মিনু হড়বড় করে নয় ছয় এক গাদা মিথ্যা কথা বলে যেতে লাগলো।সৌরভ ফ্রেস হতে হতে সব শুনছিলো আর হাসছিলো মুখ চেপে।এমন সময় সৌরভের মা রেহানা কাপে চা আর টোস্ট বিস্কুট নিয়ে সৌরভের পাসে এসে দাঁড়ালেন।তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠলেও চোখ ভর্তি হয়ে গেল কান্নার পানিতে।

কান্না বড়ই ছোঁয়াচে কিছুই হয়নি ভাব করে অত্যন্ত গোপনে সৌরভও চোখের পানি মুছে নিলো।তার সেই ছোট্ট পুতুল পুতুল বোনটার বিয়ে আর ক’দিন পরেই।ছোট বেলায় বাবা আলতাফ সাহেবের অল্প আয়ের সংসারে দামী দামী জিনিস না থাকলেও ছিলো প্রচন্ড ভালোবাসা।মায়া মমতায় দিন কেটেছে তাদের।বড় চাহিদা কখনোই করতো না সৌরভ আর মিনু।রেহানারও ছিল না বাড়তি বায়না।

আজ চব্বিশে ফাল্গুন।সকাল থেকে বাড়িতে কাজের হৈচৈ শব্দ।অকারণে মেয়েদের হাসি শোনা যাচ্ছে।গত দুই দিন ধরেই আত্মীয়দের আসা শুরু হয়েছে।ভোরে এসেছে মিনুর বান্ধবীরা।কে যেন এক কাপ চা ধরিয়ে দিলো সৌরভকে। সৌরভ চা হাতে বাবার রুমে এসে দেখে; বাবা আলতাফ হোসেন সৌরভ আর মিনুর ছোটবেলার এলবাম দেখে কাঁদছেন।আর মেয়ের ছবিতে হাত বুলিয়ে আদর করছেন;রেহানা স্বামীর পিঠে হাত বুলিয়ে শান্তনা দিচ্ছেন আর শাড়ীর আঁচলে চোখ মুছছেন।এরকম অসহ্য সুন্দর আবেগীয় মুহূর্ত সৌরভ বেশীক্ষন দেখতে না পেরে মিনুর রুমে উঁকি দিলো।

সৌরভ অবাক বিস্ময়ে দেখলো মিনু তার সেই ছোট্ট বোনটি শাড়ী পরে হাতে মেহেদী পরছে।মিনুর চোখ মুখ খুশীতে উজ্বল।সে যেন কখনো এই মিনুকে দেখেনি।হঠাৎ চোখে চোখ পরে গেল ভাই এর সাথে।মিনু হুরমুড় করে দৌড়ে খাট থেকে আছড়ে পরলো ভাইএর বুকে।অপ্রস্তুত সৌরভ আরেকটু হলে মিনুকে নিয়ে পড়েই যেত।তাল সামলে নিয়ে সৌরভ বোনটার গাল টিপে দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে এলো।মিনু যেন বুঝতে না পারে তার ভাইটার বুক দুমড়ে মুচড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছে।বোনকে বিয়ে দিয়ে বিদায় দিতে।চোখের পানিও আর বাঁধ মানছে না।কি কষ্ট !

বিয়ে বাড়ির হাজার রকম কাজ, বাবুর্চিদের তদারকি,মেহেমানদারি ,বরের পরিবারদের অভ্যর্থণা নানা কাজে কখন মিনুর যাওয়ার সময় হয়ে গেলো টেরই পেল না সৌরভ।মিনুটা ফুলে ফুলে সাজানো গাড়িতে ওঠার শেষ মুহুর্তে কাকে যেন খুঁজছিলো ।সে ঠিকই বুঝেছিলো তার ভাই তাকে বিদায় দিতে আসবে না।নিশ্চয়ই লুকিয়ে আছে ঘরের কোন কোনে।মাকে বাবাকে জিজ্ঞেশ করেও জানতে পারলো না।

মিনু হঠাৎ সমস্ত ভীড় সরিয়ে , শাড়ীটা একটু উঁচু করে দৌড়ে চলে আসলো ছাদে।যেখানে আম গাছের ডাল গুলো ঝুলে রয়েছে।মিনু আস্তে করে ডাকলো- ভাইয়া ? সৌরভ অবাক হয়ে বললো – কিরে যাসনি? মিনু কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।
বললো তুই আমার কথা রাখিসনি ভাইয়া; ছোট বেলায় তুই বলেছিলি আমার বিয়ের সময় আমাকে কোলে করে পালকিতে তুলে দিবি; আমি এখন একা একা নিজে নিজে যাবো? সৌরভ বোনের মুখের দিখে তাকিয়ে দেখলো ভাই এর কাছে সেই ছোট্ট মিনুর আবদার।

বর যাত্রার বিয়ের গাড়ির সামনে সবাই জড়ো হয়ে দেখতে লাগলো – পৃথিবীর সব চেয়ে আদরের বোনকে বিয়ের সাজে তার ভাই কোলে করে নিয়ে আসছে ; জড়ো হওয়া মেহমান দুপাশে সড়ে তাদের জায়গা করে দিলো।মিনু নামের মেয়েটি বৌ হয়ে গাড়িতে বসলো।

আহা কি সুন্দর একটি বিদায়।তবুও কি তীব্র যন্ত্রণার। একটি মেয়ের যখন বিয়ে হয় সবার প্রথমে কষ্ট হয় ভাই বোনদের মধ্যে।এখানে লেখকের একটি কথা না বললে লেখাটি অসমাপ্ত হবে।আমার যখন বিয়ে হয় প্রতিশ্রুতি মতো আমার ছোট ভাই আমাকে কোলে করে গাড়িতে তুলে বিদায় দেয়।তখন তার পায়ে ভীষন ব্যাথা ছিল ।তার নামটা না হয় নাই বললাম – পরিশেষে সকল ভাইদের জন্য একজন বোনের ভালোবাসা।

Advertisement
spot_img