শিশু-কিশোরেরা পড়ার টেবিলে মুঠোফোনেই সময় বেশি ব্যয় করছে

147

শিশু-কিশোরেরা পড়ার টেবিলে মুঠোফোনেই সময় বেশি ব্যয় করছে। আবার অভিভাবক মুঠোফোন নিয়ে নিলে উত্তেজিত হয়ে পড়ছে এসব শিশু-কিশোরেরা। রাত জেগে স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের সাইটে বা ইন্টারনেটে সময় ব্যয় করেছে। এতে সময় অপচয়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্যের উপরে পড়ছে বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব। ক্লাসে বা পড়শুনায় ঠিক মতো মনোযোগ দিতে পারছে না। অন্যদিকে প্রাপ্ত বয়স্করাও অফিস চলাকালীন সময়ে কাজ বাদ দিয়ে পরে থাকছেন ফেসবুক, টুইটার কিংবা ইউটিউবে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দৈনন্দিন কাজকর্ম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক নাগাড়ে বেশি সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করলে এর থেকে নির্গত গামা রশ্মির প্রভাবে দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। সেই সাথে মানসিক বিষন্নতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি শারীরিক স্বাস্থ্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যতে দৈনন্দিন কার্যকর্মের অনীহা তৈরি হয়। মেজাজে অনেক সময়ই থাকে খিটখিটে। তাই স্মার্টফোন ব্যবহারের সবাইকে সচেতন হওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথা বললে শুরুতেই যার নাম আসবে তা হল ফেসবুক। স্মার্টফোন যারা ব্যবহার করেন তাদের বেশিরভাগই এই ফেসবুকে অনেক সময় ব্যয় করে থাকেন।যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি তালিকা তৈরি করার প্রজেক্ট থেকে শুরু হয়ে আজ তা বিশ্বের এক নম্বর ওয়েবসাইট। ফেসবুকে একজন ব্যবহারকারী তার আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুমহলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবেন যার মাধ্যমে তৈরি হবে সামাজিক যোগাযোগ। এমন একটি ধারণা থেকে তৈরি হলেও ফেসবুকই এখন অনেক অসামাজিক কর্মকাণ্ডের উৎসস্থল।আমাদের দেশে স্মার্ট মুঠোফোন এবংইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই তরুণ-তরুণী।

Advertisement
spot_img

আমরা যখন স্মার্টফোনের উপর মাত্রাতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ি, তখন তা আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় আমরা অহেতুক ব্যয় করে ফেলি।সংবাদমাধ্যম ব্যাংকমাইসেল ও দ্যা গার্ডিয়ান একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে। সেগুলো দেখলে বুঝতে পারবো আমরা কতটা ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছি। ব্যবহারকারীরা দৈনিক গড়ে ৪৭ বার তাদের স্মার্টফোন চেক করেন, বছরে তা সংখ্যায় দাঁড়ায় ১৭ হাজার ১৫৫ বার। দৈনিক টাচ বা ক্লিকের সংখ্যা প্রায় ২৭০০ বার। ৮৫ শতাংশ ব্যবহারকারী পরিবার, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আড্ডার সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। ৮০ শতাংশ ব্যবহারকারীরা বিছানায় ঘুমাতে যাবার মুহূর্তে স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। ১৮-২৯ বছর বয়সী একজন ব্যবহারকারী গড়ে দৈনিক ৩ ঘণ্টা স্মার্টফোনের পিছনে ব্যয় করেন। শিশুদের ক্ষেত্রে এই আসক্তির প্রভাব পড়ে সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা ‘ট্যাবলেট ফর স্কুল’ জানিয়েছে স্মার্ট ডিভাইস আসক্তিতে ঘুম কমছে শিশুদের। স্মার্টফোন আসক্তি তাদের মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করে-এমন তথ্য উঠে এসেছে একদল মার্কিন গবেষকের গবেষণায়! এছাড়া এই আসক্তি মানুষের সামজিক ও পারিবারিক বন্ধন হালকা করে দিচ্ছে।
স্মার্টফোন বর্তমান সময়ের এক অপরিহার্য অংশ। তথ্যপ্রযুক্তির এ ছোঁয়ায় জনজীবনে যেমন গতিশীলতা এসেছে তেমনি এর অপব্যবহারের কারণে নেতিবাচবক প্রভাব পড়ছে আরও বেশি। দিন দিন আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে এই স্মার্টফোন। শিশু থেকে বয়ঃজ্যেষ্ঠ সব বয়সীদের মাঝে স্মার্টফোন আসক্তি এখন চরম পর্যায়ে।

অনেকের কাছেই মুঠোফোন এমন এক যন্ত্র যা ছাড়া একটা দিনও ভাবতে পারেন না তারা। পড়াশোনা, চাকরি-বাকরি অথবা ব্যবসার কাজেই অনেকে স্মার্টফোন ব্যবহার করে থাকলেও সে সংখ্যা খুবই অল্প।ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্যমতে,নিজেদের একাকী সময় অথবা বিষন্নতার সময়ে তারা ফেসবুকে সময় ব্যয় করেন। বাস্তব জগতের সামাজিক উপাদানগুলোতে যুক্ত থাকার চেয়ে ভার্চুয়াল সামাজিক মাধ্যমে অ্যাকটিভ থাকতেই বেশি পছন্দ করে এখনকার তরুণ সমাজ।আগে পাড়া মহল্লা বা পরিবারের অনুষ্ঠানে আমরা অংশ নিতাম। বলতে গেলে অনুষ্ঠান আমরাই মাতিয়ে রাখতাম। এখন আমাদের ছেলে মেয়েদের দেখি তারা এসব অনুষ্ঠানে যেতেই চায় না। যদি যায়ও তাহলে ওই মোবাইল নিয়েই এক কোণায় বসে থাকে। আবার কাউকে দেখি শুধু সেলফি আর খাবারের ছবি তুলে ফেসবুকে দেওয়ার জন্যই এসব অনুষ্ঠানে যায়। এরা ফেসবুক, ইন্টারনেট ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। তাছাড়াও আগে দেখতাম,ছোট বাচ্ছারা টিভিতে টম অ্যান্ড জেরি বা মিকি মাউসের কার্টুন দেখত। এখন দেখি তারা মুঠোফোনে ভিডিও দেখে। মুঠোফোন না দিলে কান্নাকাটি করে এমনকি খায়ও না। এবার বুঝেন আমাদের প্রজন্মের অবস্থান কোনদিকে যাচ্ছে। তাই শিশুদের ওপর স্মার্টফোনের নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়ে সরব হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও। শীর্ষ মোবাইল ফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপলে বিনিয়োগ করা দুই প্রতিষ্ঠান শিশুদের মুঠোফোন ব্যবহারে অভিভাবক দের সতর্ক এবং সচেতন করতে অ্যাপস নির্মাণের অনুরোধ করে প্রতিষ্ঠানটিকে। জেনা পার্টনার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার টিচার্স রিটায়ারমেন্ট সিস্টেম নামের ওই দুই প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি অ্যাপলকে এক চিঠির মাধ্যমে অনুরোধ করে যে, অ্যাপল যেন এমন এক সফটওয়্যার বানায় যা দিয়ে শিশুদের বয়স এবং মুঠোফোন ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করা যায়।

আবার মুঠোফোন ব্যবহারের কারণে স্মৃতিশক্তি লোপ পাচ্ছে শিশুদের মধ্যে। ছোটবেলা থেকেই মুঠোফোনের দেওয়া তথ্যের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে যাওয়াতে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে কোন চর্চা তারা করে না।অপরদিকে চিকিৎসকেরা বলছেন, মুঠোফোন ব্যবহারের কারণে মানুষদের মাঝে স্বাস্থ্য ঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলছে। অতিরিক্ত মুঠোফোন এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে মানুষদের মধ্যে মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা দিনে ১৪ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ফোনের পেছনে ব্যয় করেন তাদের মধ্যে মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। অপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, সেলফোনের অধিক ব্যবহারে শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যায় এবং ফিটনেসের জন্য হুমকি। এবং সেলফোন ব্যবহারকারীদের অনেকেরই ফোনের প্রতি এক ধরনের আসক্তি তৈরি হয়, যার ফলে সময় মতো খাবার খাওয়া বা ভ্রমণ করার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ থাকে না। অনিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের জন্যও ওজন বৃদ্ধি পায় এবং নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। বিশেষ করে অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়ে এই সমস্যায় বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।এছাড়াও দীর্ঘমেয়াদী ফোন ব্যবহারে শিশুদের দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমন তারা বড় হয়ে অনেকে দূরের জিনিস ভালো দেখতে পায় না অনেকেই আবার স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের কল্যাণে নিজেই ডাক্তার বনে যান। ইউটিউবের ভিডিও দেখে নিজেরাই নিজেদের চিকিৎসা করেন। দোকান থেকে নিয়ে আসেন ওষুধ। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফলাফল হয় ভয়াবহ। ইউটিউবের ভিডিও দেখে ওষুধ কিনে খেয়ে মৃত্যু হয়েছে এমন নজিরও আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মুঠোফোন এবং ইন্টারনেট আসক্তি এমনই যে, সত্যিকারের মাদকাসক্তির সঙ্গে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক আসক্তির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

অন্যদিকে মনরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টারনেট অথবা মুঠোফোনে আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।মানুষ যেভাবে ইন্টারনেটে ঝুঁকে পড়ছে তা সত্যিকার অর্থেই আসক্তির মত। এটি আমাদের স্বাভাবিক কাজেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তবে সবথেকে ঝুঁকিতে আছে শিশুরা। তাদের মতে ১৮ বছর বয়সের নিচের শিশু-কিশোরদের জন্য মুঠোফোন নয়। মুঠোফোন দিলেও তার ব্যবহার সীমিত করা উচিত। শিশুদের মানসিকতা বিকাশের অন্তরায় এই ইন্টারনেট। পাশাপাশি স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের যথাযথ ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বলা যায়, বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিকে তো আর অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এর ব্যবহার যেন সঠিক এবং ভাল কাজ লাগে সেদিকে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। সবকিছুরই ভালো এবং মন্দ দুই দিক থাকে। প্রযুক্তিরও খারাপ দিক আছে। সেটিকে ভালভাবে ব্যবহার করার দায়িত্ব আমাদেরই।শিশু-কিশোর-তরুণদের প্রযুক্তিনির্ভরতা আর মোবাইলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি নিয়ে আলোচনা হয় বিস্তর। সন্তানদের মোবাইল আসক্তি নিয়ে অভিযোগ প্রায় প্রতিটি মা-বাবার। কিন্তু এদিকে মা-বাবাই যে মোবাইল আসক্তিতে তলিয়ে যাচ্ছে সেই খবর কি আমরা রাখি?সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসম্ভব জনপ্রিয়তা সম্ভবত বাস্তব জীবন আর স্ক্রিনবন্দী জীবনের মধ্যে সীমারেখা টেনে দিচ্ছে; সেখানকার একটি জীবন চেনে না আরেকটি জীবনকে। একই ব্যক্তির যেন দুটি সত্তা; একটি বাস্তবতার টানাপোড়েনে পরিপূর্ণ আর অন্যটি স্ক্রিনে কৃত্রিম আলোর মতোই ঝলমলে আর চোখধাঁধানো। দুটি জীবনের কুশীলবরা যেন অনেকটাই আলাদা। আমরা সচরাচর শিশু-কিশোর-তরুণ প্রজন্মকে স্ক্রিনবন্দী জীবনে আসক্ত হিসেবে চিহ্নিত করি।

কিন্তু আমরা যাঁরা পরিণত প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছি, তাঁরা কি সত্যিকার অর্থে এই আসক্তি থেকে দূরে আছি?
নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন ২০১৯ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয়। সান ফ্রান্সিসকো ভিত্তিক একটি সংস্থা ১০০০ জন মা-বাবা এবং তাঁদের সন্তানের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে। এতে বলা হয় যেখানে প্রতি ১০ জনে ৬ জন মা-বাবা মনে করেন, তাঁদের সন্তান মোবাইলে আসক্ত, সেখানে প্রতি ১০ জনে ৪ জন সন্তান মনে করে যে তাদের মা-বাবা মোবাইলে আসক্ত। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৮ শতাংশ কিশোর বয়সী মনে করে, তাদের মা-বাবা মোবাইলে আসক্ত। এমনকি ৪৫ শতাংশ মা-বাবা নিজেরাই মনে করেন যে তাঁরা মোবাইলে আসক্ত। শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেটের দাবিতে সোচ্চার বড়রা। কিন্তু আমরা বড়রা নিজেরাই অনেকে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার করা থেকে বহু দূরে।
আমাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের জন্য একদিকে যেমন আমরা নিজেরাই হয়রানির শিকার হচ্ছি, অন্যদিকে আমরা অন্যের হয়রানির কারণ হচ্ছি। পাবলিক পোস্টে অনেক সময় দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে চেনা মানুষগুলোর কুরুচিপূর্ণ নোংরা মন্তব্যে আঁতকে উঠতে হয়। এমনকি আমরা আমাদের চ্যাট বক্সগুলো বিশুদ্ধ রাখতে পারছি না। সাইবার বুলিং ইস্যুতে দুশ্চিন্তায় থাকা মানুষগুলো যখন নিজেরাই অন্যের হয়রানির কারণ হয়ে ওঠেন, তখন বড় অসহায় মনে হয় নিজেকে। পরিশেষে বলব,আমরা বড়রা আগে একবার নিজেদের সুঅভ্যাসগুলোর দিকে ফিরে তাকাই। নিজেরা দায়িত্বশীল হলেই না জন্ম নেবে দায়িত্বশীলতার বার্তা ছড়ানোর অধিকার।

 

Advertisement
spot_img