স্কুল-কলেজ ছেলে মেয়েরা মেতে উঠেছে মোবাইল গেমসে, জেগে উঠেছে নেশা আসক্তিতে

559

এক সময় বিকেল হলে কোন ছাত্র-যুবককে ঘরে বেঁধে রাখা যেত না। ছুটে যেত খেলার মাঠে। ফুটবল, ক্রিকেট, হাডুডু সহ বিভিন্ন খেলায় ব্যস্ত থাকত ছেলেরা। কিন্তু এখন সকাল-বিকাল কোন ছাত্র-যুবককে কোন কারন ছাড়া রাস্তায় দেখা যায় না। ঘরে বসে মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত গেমস সহ নানান আয়োজন। পাড়ার অলিগলিতে পাঁচজন বন্ধু বসে কথা বলার সময় এখন দেখা যায় না ওইখানে দেখা যায় ৫ জন থাকলে পাঁচজন এই মোবাইল নিয়ে খেলছে। কেউ কারো সাথে কথা বলার সময় নেই।
স্মার্টফোন হাতের মুঠোয় থাকায় দেশীয় খেলাধুলা দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে অতীতের ঐতিহ্য খেলাধুলা বা শারীরিক ব্যায়াম। এখন আর দেখা যায় না স্কুল-মাদ্রাসা ছুটি হলে লাটিম নিয়ে মেতে ওঠা। মার্বেল নিয়ে খেলাধুলা। ঘুড়ি নিয়ে রৌদ্রভরা দুপুরে মাঠে দৌড়ানো। শিশু-কিশোররা আজ মেতে উঠেছে মোবাইল গেমসে। জেগে উঠেছে নেশা আসক্তিতে। বর্তমান ছাত্র-যুব প্রজন্ম মাঠে গিয়ে খেলার চেয়ে মোবাইল ফোনেই বিভিন্ন গেম খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। সারাক্ষণ মোবাইল গেমস পাবজি, ফ্রি ফায়ারের মতো হিংস্র সব ভিডিও গেমস নিয়ে ব্যস্ত। ফলে তারা ঝুঁকে পড়ছে অশ্লীলতার দিকে। ধাবিত হচ্ছে বিভিন্ন অপকর্মে। জড়িয়ে পড়ছে ধর্ষণ ও মদ্যপানসহ নানা অসঙ্গতিপূর্ণ সামাজিক ব্যাধিতে। মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মানবতার বদান্যতা থেকে। সরে যাচ্ছে ইসলামের সুশীতল ছায়া থেকে। এভাবেই দিনের পর দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে যুব প্রজন্মের একঝাঁক কিশোর-কিশোরী, ছাত্র-যুবক।

Advertisement
spot_img

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, যুব ও ছাত্র সমাজ এখন বিপথে পরিচালিত হচ্ছে। যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে জাতি হতাশায় নিমজ্জিত। যুবসমাজের অবক্ষয় জাতির বুকে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। গোটা সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে। আর এই সমস্যার প্রতিকার না হলে দেশ ও জাতি ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হবে। যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে জাতীয় জীবনে নেমে আসে চরম দুঃখ-দুর্দশা, বিপর্যয় ও হতাশা। জীবনে সৎ, সুন্দর, কল্যাণকর ও শান্তির মাধ্যমে বেঁচে থাকতে হলে কতগুলো গুণের প্রয়োজন হয়। আর এই সব গুণকেই সাধারণত মূল্যবোধ বলা হয়। সামাজিক ও ধর্মীয় এসব মূল্যবোধ যুব ও ছাত্র সমাজকে সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলের দিকে পরিচালিত করে। বর্তমান সমাজে এ সকল মূল্যবোধের অনুশীলন ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে। ফলে যুবসমাজ বিপদগামী হচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনীতি ধীরে ধীরে পেশিশক্তি নির্ভর হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন বিপথগামী যুবকদের ব্যবহার করছে। আবার বিপথগামী ছাত্র-যুবকেরা কেন্দ্রীয় এবং জাতীয় নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে যায়। দুর্বল অর্থনৈতিক সমাজব্যবস্থাও যুব সমাজের অবক্ষয়ের জন্য অনেকাংশে দায়ী।

মোবাইলে যেভাবে ধ্বংস হচ্ছে ছাত্র- যুব সমাজ

বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ যুবক সুযোগ পেলে মোবাইল এ পর্ণ ছবি বা ভিডিও দেখে। ফলে লেখাপড়া বাদ দিয়ে তারা যৌনতার বিষয়ে আগ্রহী ও তৎপর হয়ে উঠছে । যার পরিণতিতে চরিত্রের দিক থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যুব সমাজের বিরাট অংশ। আর যুব সমাজ ধ্বংস হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো এটা । মোবাইলে পর্ণ ছবি বা ভিডিও দেখে তারা যৌন উত্তেজনায় উত্তেজিত হয়ে ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়। মেয়েরাও এ বিষয়ে পিছিয়ে থাকছে না ।আর এ কারণে বাংলাদেশে ১ বছরের শিশু থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষণ হচ্ছে। আর এটার জন্য অনেকটাই দায়ী মোবাইল।
এমনকি ক্লাসে বসেই ৬০ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী পর্ণ ছবি বা ভিডিও দেখে। মোবাইলের কারণে আজ তাদের লেখাপড়ার অবস্থা অনেকটা খারাপ। আর মোবাইল এ ক্যামেরা থাকায় হুট হাট করে ক্লাসে বসে থাকা বা রাস্তায় হেটে যাওয়া কোনো মেয়ের ছবি তুলে নিচ্ছে তারা । আবার সেই ছবি তারা ভাইরাল করছে বিভিন্ন ওয়েব সাইটের মাধ্যমে।

বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ যুবক প্রেম করার উদ্দেশে মোবাইল ব্যবহার করে। রাতের পর রাত জেগে কথা বলতে বলতে তাদের স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে। কারণ ফোনে অধিক কথা বলা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য খুব ক্ষতিকর ।বিশেষ করে ব্রেনের ও হার্ট এর অনেক ক্ষতি করে এটি। ফোনে কথা বলার এক পর্যায়ে তারা অশ্লীল কথা বলা শুরু করে । আবার সেই কথা রেকর্ড করে রাখে তাদের ফোনে। আবার ভালোবাসায় বিভোর হয়ে একে অপরের সাথে অনৈতিক কাজের সাথে লিপ্ত হয়। তাদের সেই কাজ গুলো তারা তাদের ফোন দিয়ে ভিডিও করে রাখে। আর এ দিক মেয়েরাও পিছিয়ে থাকছে না। এক সময় কোন কারণে তাদের সম্পর্ক যখন নষ্ট হয় তখন সেই রেকর্ড করা ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভাইরাল করে দেয়। আর এর কারণে অনেক প্রেমের শেষ পরিণতি হয়ে দাড়ায় আত্মহত্যা। আর বাংলাদেশে এমন ঘটনার দৃষ্টান্ত রয়েছে লক্ষ লক্ষ।

বাংলাদেশে এ সময়ের আলোচিত এক সমস্যার প্রতিচ্ছবি হলো পরকীয়া। যার কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে অনেক সংসার। প্রতিদিন পরকীয়ার কারণে সন্তান ও সাজানো সংসার ফেলে অন্ধকার পৃথিবীর দিকে পাড়ি দিচ্ছে হাজার হাজার নারী পুরুষ । আর এই কাজের সাথে আজ বেশি জড়িয়ে পড়ছে যুব সমাজ। আর এই পরকীয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মোবাইল।
মোবাইলের কারণে আজ অনেক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হচ্ছে আমাদের। বাসা-বাড়ি, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ অফিসে ও মার্কেটে তো বটেই, রাস্তায় চলতে চলতেও মোবাইলে কথা বলছে মানুষ। আইনে নিষিদ্ধ করা হলেও ব্যক্তি মালিক থেকে শুরু করে, বাস-ট্রাকের চালক গাড়ি চালানোর সময়ও মোবাইলে কথা বলছে। এর ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে যখন-তখন এবং যেখানে-সেখানে।
এখানে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে জানানো দরকার, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলে কথা বলায় যেসব দুর্ঘটনা ঘটে সেগুলোতে শুধু চালকদেরই অপমৃত্যু ঘটে না, মারা যায় অনেক পথচারী এবং অন্য গাড়ির লোকজনও। দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বহু মানুষকে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। অনেকে এমনকি সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্বও বরণ করে। আবার পথে-ঘাটে এই দুর্ঘটনার কারণে প্রাণ চলে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের। এর কারণ মোবাইল ফোন।

বেকারত্ব ও মাদকাসক্তির প্রভাব : আমাদের দেশের যেসব ছাত্র-যুব সমাজ লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পায় না তারা নানা রকম মানসিক হতাশায় ভোগে। চাকরির অভাবে তারা অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। দীর্ঘ সময় এই অবস্থা চলতে থাকলে তাদের ভেতরে ক্ষোভ জন্ম নেয়। আর এই ক্ষোভ থেকেই তারা চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা ও অপহরণসহ নানা পাপ কাজে লিপ্ত হয়। আবার কোনো দেশের যুব সম্প্রদায় মাদকাসক্ত হওয়া মানে নৈতিক চরিত্রের চূড়ান্ত অধঃপতন। ফেনসিডিল, গাঁজা,ইয়াবা, আফিম, ভাং ইত্যাদি মাদকদ্রব্য সর্বত্র পাওয়া যায়। আর এ সুযোগ গ্রহণ করে যুবসমাজ ধ্বংস হচ্ছে।

মোবাইল গেমস এটি একটি বিনোদন। একটি গেমিং অ্যাডিকশন। আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম উপহার। বেকার মানুষের প্রিয় বন্ধু। ছাত্র-যুব প্রজন্মের সর্বক্ষণের সঙ্গী। আরও রয়েছে কত কি! তবে এত কিছুর পরেও এটিকেই আমরা বলছি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি। আর এটিই বাস্তবতা। বর্তমান সময়টা তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। তথ্যপ্রযুক্তি সবকিছু এনে দিয়েছে আমাদের হাতের মুঠোয়। করে দিয়েছে সব কাজের সুযোগ-সুবিধা। মানুষের বিকল্প এখন আধুনিক প্রযুক্তি। তথ্যপ্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় সবার হাতে হাতে নানা ধরনের ডিভাইস রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিক ভিডিও গেমস অর্থাৎ গেমিং অ্যাডিকশন। বর্তমান সময়ে এমন তরুন-যুবক খুব দুর্লভ, যার কাছে স্মার্টফোন আছে; কিন্তু গেমস খেলে না। এটি আমাদের যেমন সাময়িক আনন্দ দিচ্ছে, ঠিক তেমনি কেড়ে নিচ্ছে মহামূল্যবান অনেক কিছু। মারা যাচ্ছে শিশু-কিশোরের সুপ্ত প্রতিভা। চুষে খাচ্ছে মহামূল্যবান সময়। নষ্ট করছে কোটি মানুষের অমূল্য জীবন। শেষ করছে মাতৃভূমির সুনাম ও জশ-খ্যাতি।বাবা মা গেমস খেলতে বাধা দেওয়ায় অত্বহত্যার মতো অনেক ঘটনা ঘটেছে আমাদের সমাজে।

ভিডিও গেমসের প্রতি শিশু-কিশোরদের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। তবে আগের তুলনায় এখন শতগুণ বেশি। এই আসক্তিকে সম্প্রতি মানসিক রোগের তালিকায় অর্থাৎ সামাজিক ব্যাধিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাই স্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, শিশুদের এসব ভার্চুয়াল গেম থেকে দূরে রেখে আবার মাঠের খেলায় ফেরাতে হবে। না হলে তরুণ প্রজন্ম মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ‘প্রতিনিয়ত এসব ভিডিও গেমস্ খেললে শরীরে এক ধরনের হরমোন নিঃসারণ হয়। এতে শিশু সবকিছু নিয়েই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়ে যায়। মেজাজ খিটমিটে হয়ে যায়। তো আমরা এমন নানা আপত্তিকর সমস্যা থেকে কীভাবে রেহাই পেতে পারি।

আমাদের সচেতনতায় হতে পারে আমাদের মুক্তির পথ। তার মধ্যে কয়েকটি হলো- ১. ইন্টারনেট ব্যবহারের আগে নিজেকে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, তা আগে বিবেচনা করতে হবে। ২. ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দিলে তার একটি সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে এবং সময় মেনে চলতে উৎসাহিত করতে হবে। ৩. পিতা-মাতা বাসার ডেস্কটপ কম্পিউটারটি প্রকাশ্য স্থানে রাখুন। শিশু যাতে আপনার সামনে মুঠোফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ইত্যাদি ব্যবহার করে। ৪. বেশি বেশি বই কিনতে হবে, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বই হোক নিত্যদিনের সঙ্গী। বইয়ের আলো জেমসের অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। ৫. ইন্টারনেট বা গেম আসক্তি কিন্তু মাদকাসক্তির মতোই একটি সমস্যা। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিয়ে এই আসক্তি দূর করতে হবে।

পারিবারিক মূল্যবোধঃ প্রতিটি মানুষই কোনো একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। শিশুকাল থেকে সে পরিবারেই বেড়ে উঠে। তারপর সে ধীরে ধীরে সমাজের সাথে পরিচিত হয়। শিশুদের মন শৈশবকালে কাদার মতো নরম থাকে। এই সময় তাদের ইচ্ছা মতো গড়ে তোলা যায়। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে পরিবারই পারে তাদের সন্তানদের উপযুক্ত মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে। তাই আমরা অযথা মোবাইল গেমস খেলে আমাদের মূল্যবান সময়কে নষ্ট না করি। জীবনকে গেমস্ ও মাদকাসক্তিতে তছনছ করে না ফেলি।

@ হাসান মুকুল
সাংবাদিক

Advertisement
spot_img